প্রযুক্তি শিক্ষায় নারীদের স্বনির্ভরতার স্বপ্ন, বরিশাল মহিলা পলিটেকনিকে যাত্রা শুরু!
- আপডেট সময় : ১০:২১:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে
প্রযুক্তি শিক্ষায় স্বনির্ভরতার স্বপ্ন, বরিশাল মহিলা পলিটেকনিকে যাত্রা শুরু!
এম. আর শুভ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে বরিশাল বিভাগের প্রথম সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করেছে বরিশাল সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এর মধ্য দিয়ে বরিশাল অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। আধুনিক অবকাঠামো, আবাসন সুবিধা এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে দক্ষ নারী জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে আর্কিটেকচার টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এই দুটি বিভাগে পাঠদান শুরু হয়েছে। প্রতিটি বিভাগে আসনসংখ্যা ৫০টি করে মোট আসন রয়েছে ১০০টি। এর বিপরীতে প্রথম শিক্ষাবর্ষে ৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক যাত্রা আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে পাঠদান শুরু হয়েছে। আর্কিটেকচার টেকনোলজি ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে পড়াশোনার সুযোগ শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তাঁদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠান ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
★আগামী বছর চালু হবে আরও দুটি বিভাগ
প্রাথমিকভাবে দুটি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে বিভাগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। আগামী বছর সিভিল টেকনোলজি ও অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং টেকনোলজি নামে আরও দুটি প্রযুক্তি বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিভাগ চালু হলে শিক্ষার্থীদের সামনে কারিগরি শিক্ষার আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন বিভাগ যুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি নির্মাণশিল্প, পোশাকশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রের জন্য দক্ষ নারী কর্মী তৈরির সুযোগও বাড়বে।
★৫৫ কোটি টাকার প্রকল্পে আধুনিক ক্যাম্পাস
নগরীর আলেকান্দায় ঐতিহাসিক পরেশ সাগর মাঠের উত্তর পাশে অবস্থিত বরিশাল সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২০-২১ অর্থবছরে। প্রায় ৩ একর ১৮ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে এর ক্যাম্পাস। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।
ক্যাম্পাসে রয়েছে তিনটি ছয়তলা ভবন, ছাত্রীনিবাস, শিক্ষক ডরমেটরি, স্টাফ কোয়ার্টার ও অধ্যক্ষের বাসভবন। পরিকল্পিত অবকাঠামো নিয়ে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্যাম্পাসের অন্যান্য ভবনের নির্মাণকাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ওয়ার্কশপ ভবনের নির্মাণকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ওয়ার্কশপ ভবনের কাজ সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ আরও সুসংহত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
★২০০ আসনের আধুনিক ছাত্রীনিবাস
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো ছাত্রীদের জন্য নির্মিত চারতলা অত্যাধুনিক হোস্টেল ভবন। এতে আসনসংখ্যা ২০০টি। দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে মেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য নগরীতে আসেন। তাঁদের অনেকের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার আগ্রহ থাকলেও আবাসনসংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ পরিস্থিতিতে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ২০০ আসনবিশিষ্ট ছাত্রীনিবাস নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দূরের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের উদ্বেগ কমাতেও নিরাপদ আবাসনব্যবস্থা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
★দায়িত্বে রয়েছেন ১৭ শিক্ষক-কর্মচারী
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অধ্যক্ষ, ইন্সট্রাক্টর, সহকারী ইন্সট্রাক্টর ও ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরসহ মোট ১৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের উপাধ্যক্ষ এস. এম. সামচুন নাহার।
প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিতসংখ্যক বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীসংখ্যা ও বিভাগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধিও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, প্রশিক্ষণসুবিধা, ব্যবহারিক শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
★প্রযুক্তি শিক্ষায় এগিয়ে যাবে নারী, বাড়বে স্বনির্ভরতার সুযোগ
কারিগরি শিক্ষা কেবল সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ তৈরি করে। বিশেষ করে নারীদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং আর্কিটেকচার টেকনোলজির মতো বিষয়ে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট পেশায় নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে সিভিল ও অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং টেকনোলজি চালু হলে নির্মাণ ও পোশাকশিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষতা অর্জনের পথ আরও প্রসারিত হবে।
নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং পরিবারে অর্থনৈতিক অবদান রাখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে মানসম্মত পাঠদান, পর্যাপ্ত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
★স্বনির্ভর নারী গড়ার প্রত্যাশা
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা এস. এম. সামচুন নাহার জানান, প্রযুক্তি শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়া এবং তাঁদের স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলাই এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ করে তুলবেন এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও জানান, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেলে নারী শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখতে পারবেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বরিশাল সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এ অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হলো। আধুনিক অবকাঠামো, আবাসন সুবিধা এবং পর্যায়ক্রমে নতুন প্রযুক্তি বিভাগ চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ নারী জনশক্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।



















