ঢাকা   ৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ । ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ । বৃহস্পতিবার । সকাল ৬:৪৯

৬ বছরে হজের খরচ বেড়েছে দেড় গুণের বেশি

অনলাইন ডেস্কঃ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি হলো হজ। এটি মুসলিমদের আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। সামর্থবান মুসলিমদের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। প্রত্যেক মুসলমানের স্বপ্ন থাকে জীবনে অন্তত একবার পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালন করার। কয়েক বছর আগে মধ্যবিত্তদের জন্যও হজ করা সাধ্যের মধ্যে ছিল। প্রতি বছর হজের খরচ বাড়ায় এখন তা মধ্যবিত্তদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। গেল ৬ বছরে হজের খরচ বেড়েছে দেড় গুণেরও বেশি।

গেল ১১ মে চলতি বছর হজে যেতে সরকারিভাবে দুটি প্যাকেজ ও বেসরকারিভাবে একটি প্যাকেজ চূড়ান্ত করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। ঘোষিত প্যাকেজ অনুযায়ী, এবার প্রত্যেক হজযাত্রীর লাখ টাকারও বেশি বাড়তি খরচ হবে। সরকারিভাবে হজে যেতে প্যাকেজ-১ এ ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৪০ এবং প্যাকেজ-২ এ ৪ লাখ ৬২ হাজার ১৫০ টাকা খরচ ধরা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে একটি প্যাকেজে খরচ ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬৩০ টাকা। প্যাকেজ-১ এর ক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে এক লাখ ২ হাজার ৩৪০ টাকা, প্যাকেজ-২ এর ক্ষেত্রে এবার খরচ বেড়েছে ১ লাখ ২ লাখ ১৫০ টাকা। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সৌদি সরকারের বিধিনিষেধের মুখে গত দুই বছর বাংলাদেশি হজযাত্রীরা হজ পালন করতে পারেননি।

এর আগে ৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হজের ব্যয় বেড়েছে প্রতিবছরই। ২০২০ সালে প্যাকেজ-১-এ খরচ ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, প্যাকেজ-২-এ ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে প্যাকেজ-১ এ খরচ ৪ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং প্যাকেজ-২-এ ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে প্যাকেজ-১ ছিল ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯২৯ টাকা। প্যাকেজ-২-এ ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ টাকা। ২০১৭ সালে প্যাকেজ-১ ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫০৮ টাকা, প্যাকেজ-২-এ ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ টাকা। ২০১৬ সালে প্যাকেজ ১-এ ৩ লাখ ৬০ হাজার ২৮ টাকা। ২০১৫ সালে প্যাকেজ ১-এ ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৫ টাকা, প্যাকেজ ২-এ ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০৬ টাকা।

সে হিসেবে ৬ বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালের থেকে চলতি বছর ২০২২ সালে (করোনার কারণে মাঝখানে বন্ধ থাকা দুই বছর বাদে) হজের খরচ বেড়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯১৯ টাকা। যা দেড় গুণেরও বেশি। শুধু এবছরই খরচ বেড়েছে লাখ টাকার বেশি।

এ বিষয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেন, ‘২০২০ সালে সৌদি রিয়ালের বিনিময় হার ছিল ২৩ টাকা। আজ এই হারের পরিমাণ ২৪ টাকা ৩০ পয়সা। এটিও প্যাকেজ মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এছাড়া সৌদি আরব পর্বে সব খাতের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট, সার্ভিস চার্জ কর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুয়াচ্ছার খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে। প্যাকেজ মূল্যবৃদ্ধির জন্য এ কারণগুলো দায়ী।’

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম মুহিব্বুল্লাহ বাকি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হজ তো মূলত আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। এক্ষেত্রে যখন যার সামর্থ হবে তখনই তাকে হজ পালন করতে হবে। একসময় খরচ কম ছিল তখন যার সামর্থ ছিল সে করেছে। এখন বেশি সে অনুযায়ী যার সামর্থ হয় সে করবে। শুধুমাত্র সামর্থ থাকার পরও না করলে গুনাহগার হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দেশে সরকার ভর্তুকি দেয়। আমাদের দেশে সরকার কেন ভর্তুকি দেয় না সেটা সরকারের বিষয়। তবে ভর্তুকি দলে সেটা সবার জন্য ভালো। যারা হজ করতে ইচ্ছুক তারা যদি সম্মিলিতভাবে সরকারকে আবেদন জানায় ভর্তুকি দেওয়ার জন্য তাহলে সরকার সেটা বিবেচনা করবে।’

জানা গেছে, এশিয়ার মধ্যে হজ পালনে সবথেকে কম খরচ হয় ইন্দোনেশিয়া। এ বছর ইন্দোনেশিয়া থেকে হজে যেতে একজন মুসল্লিকে দুই লাখ ৩৮ হাজার ৪৫৩ বাংলাদেশি টাকা (৩,৯৮,৮৬,০০৯ ইন্দোনেশীয় রুপি) দিতে হবে বলে গত ১৪ এপ্রিল জানান দেশটির ধর্মমন্ত্রী ইয়াকুত ছলিল৷ যদিও মুসল্লি প্রতি খরচ হবে চার লাখ ৮৮ হাজার ২৬০ টাকা। বাকি টাকাটা ‘হজ ফাণ্ড ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’ বা বিপিকেএইচ এর মাধ্যমে ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার।

এছাড়াও পাকিস্তানে চূড়ান্ত হয়নি। তবে জনপ্রতি খরচ বাংলাদেশি টাকায় তিন লাখ ১১ হাজার থেকে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুহাম্মদ উমর বাট। মালয়েশিয়ায় ২২ এপ্রিল হজে যাওয়ার খরচ ঘোষণা করা হয়। বি৪০ গ্রুপের (যে পরিবারের মাসিক আয় সাড়ে ৯৬ হাজার টাকার কম) মুসল্লিদের জন্য খরচ দুই লাখ ১৮ হাজার ৭৫৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর যাদের আয় বেশি তাদের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ টাকা। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ধর্ম বিভাগের মন্ত্রী ইদ্রিস আহমাদ সম্প্রতি জানান, প্রতিবছর হজে ভর্তুকি হিসেবে সরকার প্রায় ছয়শ থেকে আটশ কোটি টাকা খরচ করে থাকে।

ভারতে এবারের হজের খরচের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত এক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে হজে যেতে জনপ্রতি খরচ হয়েছিল প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি টাকা। তবে ওই সময় পশ্চিমবঙ্গ হজ কমিটি ২০২১ সালের হজের খরচ অনেক বাড়িয়ে চার লাখ ২৩ হাজার ৫৭১ টাকা নির্ধারণ করেছিল। ২০১৮ সালে ভারতে হজ ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চলতি বছর ১০ লাখ হজযাত্রীকে হজ করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব। করোনা মহামারি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগের বছর স্বল্পসংখ্যক হজযাত্রী হজের অনুমতি পেয়েছিলেন।

সৌদির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজযাত্রীদের বয়স ৬৫ বছরের নিচে হতে হবে এবং পূর্ণ ডোজ টিকা নেওয়া থাকা লাগবে। আর সৌদির উদ্দেশে রওনা হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পিসিআর টেস্টের নেগেটিভ সনদ লাগবে। স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বর্ধিত হজযাত্রীর এ সংখ্যা কোটা অনুযায়ী দেশগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে।
এদিকে চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে হজের ফ্লাইট ৩১ মে থেকে পিছিয়ে ৫ জুন থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের যাবতীয় কাজ শেষ করতে না পারায় ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ৫ জুন থেকে হজ ফ্লাইট পরিচালনার অনুরোধ জানিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৮ জুলাই সৌদি আরবে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। এবার বাংলাদেশ থেকে ৫৭ হাজার ৫৮৫ জন হজ পালনের সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫৩ হাজার ৫৮৫ জন হজে যেতে পারবেন।

%d bloggers like this: