ঢাকা   ৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ । ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ । বৃহস্পতিবার । সকাল ৮:১২

ফিরে দেখা-২০২০, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ১৮৮, ধর্ষণ ১৬২৭

অনলাইন ডেস্কঃ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে ২০২০ সালে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি বলে জানিয়েছে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বৈশ্বিক আইনের শাসন সূচকে ২০১৯ সালের তুলনায় বিদায়ী বছরে তিনধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশ ১১৫তম অবস্থানে রয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা। এ ছাড়া করোনাকালেও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভুত হত্যার ঘটনা অব্যাহত ছিল।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির এবং সহকারী সমন্বয়কারী অনির্বান সাহা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সময় মানবাধিকার সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশসহ মতামত তুলে ধরেন আসকের নির্বাহী কামিটির মহাসচিব মো. নূর খান এবং নির্বাহী পরিচালক গোলাম মনোয়ার কামাল।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, টেকনাফের মেরিন ড্রাইভে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামের গুলি করে হত্যার ঘটনায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে চলমান প্রশ্ন আবার সামনে উঠে এসেছে। মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা কম হলেও বছরজুড়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে, বিশেষ করে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অনেক ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৮৮ জন নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুমের ঘটনাও ঘটে।

গত ১০ মার্চ ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর। পরদিন হাতিরপুল এলাকা থেকে ‘নিখোঁজ’ হন ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল। এর ৫৩ দিন পর ৩ মে গভীর রাতে যশোরের বেনাপোল সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ সংলগ্ন এলাকা থেকে কাজলকে উদ্ধারের দাবি করে বিজিবি।এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরী বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন ও গুলি করে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বছরজুড়ে। এ বছর ভারতের সীমান্তরী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ৪২ জন এবং শারীরিক নির্যাতনে ৭ জনসহ মোট ৪৯ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

আসকের সুপারিশে বলা হয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশনকে কার্যকর করতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ বন্ধ করা হোক।কমিশনগুলোয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ বন্ধের কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আসকের নির্বাহী কামিটির মহাসচিব মো. নূর খান কারণ হিসেবে বলেন, ‘এসব পদে আমলাদের নিয়োগ দিলে তারা কোনো না কোনোভাবে সরকার দ্বারা প্রভাবিত হন। ’তিনি বলেন, ‘প্যারিস প্রিন্সিপালের ভিত্তিতে কমিশন গঠন করা হয়েছে। সে অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের নিয়োগ দেওয়া যায় না।’

আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরে সারা দেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৬২৭ নারী। ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৫৩ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ১৪১৩ নারী এবং ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২।আসক বলছে, ২০২০ সালে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ২০১ নারী। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন ১০৬ পুরুষ। উত্ত্যক্তকরণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ নারী। এ ছাড়া যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী ও ১১ পুরুষসহ খুন হয়েছেন ১৪ জন।সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১৩০টি মামলা হয়েছে এবং এসব মামলায় ২৭১ জনকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া ভিন্নমতের প্রতি হুমকি, হামলা ও ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

করোনা মহামারির মধ্যেও নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র ছিল ২০২০-এর অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। বছরজুড়ে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাসহ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটেছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুসহ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর বছরের বিভিন্ন সময় হামলার ঘটনা ঘটেছে।

তবে আশার খবর হলো করোনা মহামারির মধ্যেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে সম হয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে লিঙ্গ সমতা, দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন সূচকের আলোকে জাতিসংঘ প্রণীত বিশ্ব মানব উন্নয়ন সূচকে এ বছর বাংলাদেশের দুই ধাপ অগ্রগতি হয়েছে।

%d bloggers like this: