Logo
নোটিশ :
স্বাগতম একুশের আলো .....

করোনায় মৃত্যু কমানো যাচ্ছেনাঃ অকার্যকর বিধিনিষেধ দ্বিধায় সরকার

করোনায় মৃত্যু কমানো যাচ্ছেনাঃ অকার্যকর বিধিনিষেধ দ্বিধায় সরকার

লকডাউন’ নাকি ‘কঠোর বিধিনিষেধ’, কী করা যাবে, কী করা যাবে না এই নিয়ে আলোচনা সমালোচনার মধ্যেই ১১ দফা নির্দেশনা একেবারেই ভেঙে পড়েছে দ্বিতীয় দিন গতকাল মঙ্গলবার। গত সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য ১১ দফা কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে প্রজ্ঞাপন দেয় সরকার। তাতে বলা হয়, সীমিত আকারে অফিস আদালত চলবে এবং হোটেল রেস্তোরা খোলা থাকবে, তবে বসে কেউ খেতে পারবে না। অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত থাকলেও আর দূরপাল্লার পরিবহন ও সব ধরনের পরিবহন বন্ধ রাখা হয়। শপিংমল দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থাকলেও বইমেলা খোলার রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে কঠোর বিধিনিষেধ নিয়েই বিভ্রান্তি দেখা দেয়। পরিবহন সংকট ও অধিক ভাড়া গুণে অফিসগামী মানুষের ক্ষোভের মুখে গতকাল সরকারের লকডাউনের দ্বিতীয় দিন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ১১ সিটি করপোরেশন এলাকায় গণপরিবহন চলাচলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বইমেলার উদাহরণ দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে এপ্রিলের শুরু থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। দেশের ইতিহাসে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ মৃত্যু ৬৬ জন ও সর্বোচ্চ শনাক্ত ৭ হাজার ২১৩ জন। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন যদি ৪-৫ হাজার রোগী বাড়ে তাহলে সারা শহরকে হাসপাতাল বানালেও সামাল দেওয়া সম্ভব না। জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি। একইভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে তার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, লকডাউন বলি আর যাই বলি এই ১১ দফার বিষয়ে সিরিয়াস হতে হবে। এখনই হাসপাতালে জায়গায় নেই রোগী আরও বাড়লে চিকিৎসাসেবা দেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়বে। চলমান লকডাউন সুচিন্তিত ছিল না বলে মনে করেন করোনা মোকাবিলায় সরকারের গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, সরকার যেটা করেছে সেটা সুচিন্তিত ছিল না। কারণ, মানুষের অফিস খোলা। কিন্তু বাস বন্ধ করে দিল। তাহলে মানুষ বাসায় থেকে অফিস যাবে কী করে? হেঁটে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। সে জন্য বাসগুলো এখন আবার ছেড়ে দিয়েছে। বাসগুলোতে যদি স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়, তাহলে বাসে যত সিট আছে, সেটার অর্ধেক যাত্রী নিতে হবে। তার মানে যত বাস ঢাকা শহরে চলত, তার দ্বিগুণ বাস চালাতে হবে। বাসগুলোতে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হবে। তাহলে এই সেক্টরটা সচল হবে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হলে আর্মি, বিজিবি, পুলিশ নামাতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। যেখানে যেখানে গণপরিবহন আছে, সেখানেই এই ব্যবস্থা চলবে। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানাতে না পারি, তাহলে গণপরিবহন আবার বন্ধ হবে। মানুষের দুর্ভোগ আবার বাড়বে। মানুষ হেঁটে হেঁটে অফিসে যাবে। এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, সঠিকভাবে সুচিন্তিত কাজ করতে হবে। দোকানদাররা বলছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করবে, দোকান খুলে দিন। তারা তো বলবেই। কারণ তারা খাবে কী? তাদের সংসার আছে। কিন্তু কর্মকর্তারা সেসব বিবেচনা না করেই দোকান বন্ধ করে দিল। এখন খুলে দিতে হবে। সেখানেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান চালাতে হবে। যেখানে এক ঘণ্টায় ১০০ জন খরিদ্দার আসত, সেখানে এখন ৫০ জন আসবে। এটা করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, আজ-কালের মধ্যে নির্দেশনায় আরও পরিবর্তন আসবে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। তিনি বলেন, দুই/একদিনের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিকল্পনায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না এ প্রশ্নে ফরহাদ হোসেন বলেন, “জনগণের সুরক্ষার জন্যই এই ১১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল সংক্রমণ এবং মৃত্যুর রেকর্ড। পরিস্থিতি খারাপ হলে সরকার পূর্ণ লকডাউনে যাবে কি না?এই প্রশ্নে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, কাল-পরশু এ ব্যাপারে ঘোষণা আসবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম দফার নির্দেশনা ভেঙে পড়েছে। কারণ হলো সমন্বয়হীনতা। গতবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগালেও হতো। কিন্তু এবার হুট করে কী ধরনের বিধিনিষেধ দেওয়া হলোযা একেবারেই সাংঘর্ষিক। কী প্রয়োজন কী প্রয়োজন নেইতা নিয়ে গবেষণা নেই। প্রজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যবিধি কীভাবে রক্ষা করা যায় তা স্পষ্ট নেই। উচ্চ সংক্রমণে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া উচিত ছিল। প্রথম দিন যখন দেখল নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না, তখনই বসে আলোচনা করা যেত। আবার সংক্রমণ বাড়ছে, কেউ জানে না পরবর্তী পদক্ষেপ কী? এতে তো জনগণের মধ্যে হতাশা এসে পড়বে। তারা বৃহস্পতিবারের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন তৈরির পরামর্শ দেন।

সরকারের নেওয়া বিধিনিষেধ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ। তিনি বলেন, সাত দিনের লকডাউনের তেমন প্রভাব পড়বে না। তবে আন্তঃজেলায় যে সংক্রমণ ছড়াত, সেটা কিছুটা কমবে। ঢাকা থেকে সংক্রমণ বাইরে ছড়াতে পারত এবং সেটা আরও খারাপ হতে পারত সেটা কিছুটা কমবে। কারণ, যান চলাচল বন্ধ। কিন্তু ঢাকা শহরেই দুই কোটির মতো মানুষ বাস করে। ঢাকা শহরে যেগুলো ছড়াচ্ছে, সেটা তো থামানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। যে অবস্থা দেখছি, ধীরে ধীরে সরকারের লকডাউনের বিরোধিতা, ক্ষোভ বাড়ছে। তার মানে শহরের ভেতর ছড়ানোর যে ব্যবস্থা, সেটা বজায় থাকল। যারা অফিসে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কেউ আক্রান্ত, সে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাবেই নিশ্চিত। আবার বাস থেকে আক্রান্ত হয়ে ভাইরাস বাসায় নিয়ে গেল। বাসার লোক আক্রান্ত হবে। এভাবে একটা সংক্রমণ চক্র চলতেই থাকবে। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকার এখন লকডাউন দিয়েছে কিছুটা বাধ্য হয়ে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে এটা একটা সহজ পদ্ধতি। তারা আর বেশি কিছু জানে না। তারা মনে করে এতে কিছু গাড়ি-ঘোড়া চলবে না, অফিস-আদালত বন্ধ হবে, এতে জনস্বাস্থ্যের কিছু নেই। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টা হলো পুরো সংক্রমণ কীভাবে হয়, সেটা নিয়ন্ত্রণে কী রকম ব্যবস্থাপনা হবে, সবগুলো যদি একসঙ্গে না নেওয়া যায়, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক আহমেদ বলেন, সরকার আর্থ-সামাজিক দিক বিবেচনা করে এই ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। এটা কার্যকর করতে পারলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ধরে কড়াকড়ি করতে হবে। হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এই লকডাউনের ফলে সংক্রমণ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ছড়ানোর বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। আবার বইমেলা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত এবং শপিংমলসহ অন্যসব দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তেও ক্ষুব্ধ হন ব্যবসায়ীরা। ফলে দেশব্যাপী দোকান মালিক ও অন্যান্য সেক্টরের ব্যবসায়ীরা রাস্তায় বিক্ষোভ করেন দোকান খোলা রাখার দাবিতে। গতকাল মঙ্গলবার সরকারের নির্দেশনার দ্বিতীয় দিন পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার নেয়। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে দেশের ১১ সিটি করপোরেশনে গণপরিবহন খোলার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *