Logo
নোটিশ :
স্বাগতম একুশের আলো .....
দেশে করোনার বন্ধে পিএইচডির রেকর্ড

দেশে করোনার বন্ধে পিএইচডির রেকর্ড

অনলাইন ডেস্কঃ করোনা সংক্রমণ শনাক্তের পর ২০২০ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে একে একে বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। এরপর বছরজুড়েই বন্ধ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বলছে, ২০২০ সালে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ৬৪১ জন ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি) ডিগ্রি পেয়েছেন। এক বছরে পিএইচডি প্রদানের এ সংখ্যা স্মরণকালের সর্বোচ্চ।

একসময় শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যেই মূলত পিএইচডি গ্রহণের বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। তবে কয়েক বছর ধরে দেশে নন-একাডেমিক পেশাজীবীদের মধ্যেও উচ্চতর এ ডিগ্রির প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। বিশেষ করে আমলা, পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তাদের পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণের হার চোখে পড়ার মতো।

ইউজিসির গত কয়েক বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পিএইচডি ডিগ্রি পেতে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছিলেন ৮৯০ জন। এর মধ্যে ৬৪১ জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছেন, এ সংখ্যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর আগের বছর পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছিলেন ২৩৩ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের হার বেড়েছে ১৭৫ শতাংশ। ২০১৮ সালে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয়েছে ৪০০ জনকে।

সংখ্যায় উল্লম্ফন ঘটলেও মানের বিবেচনায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেয়া পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষাবিদদের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, পিএইচডি ডিগ্রি বৃদ্ধির সংখ্যাগত এ চিত্র দিয়ে দেশের গবেষণানির্ভর উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে, এটা দাবি করার সুযোগ নেই। কারণ পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে যে প্রভাব ও সাফল্য আসার কথা, সেটি দৃশ্যমান নয়। যখন একটি পিএইচডি গবেষণার নিবন্ধ মানসম্মত পিআর রিভিউড ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশ হয়, তখন ওই গবেষণা ফলাফলের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে ও সাইটেশন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে দেয়া পিএইচডি ডিগ্রির গবেষণা নিবন্ধের ৫ শতাংশও আন্তর্জাতিক মানসম্মত জার্নালে প্রকাশ হয় বলে মনে হয় না।

এসব কারণে দেশে আন্তর্জাতিক মানের বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ বা গবেষকের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে মনে করেন দুর্যোগবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার এ অধ্যাপক। তিনি বলেন, এত পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের বিদেশনির্ভরতা অনেক বেশি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত গবেষকদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত বা উৎসাহিত করা হয় না। সর্বোপরি দেখা যাচ্ছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে দেয়া পিএইচডি ডিগ্রির গবেষণা নিবন্ধগুলো বহুলাংশেই কাগজের স্তূপে পরিণত হওয়া ছাড়া জাতীয় উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

ইউজিসির তথ্যমতে, ২০১৭ সালে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পিএইচডি দেয়া হয় ৪৪১ জনকে। এর আগে ২০১৬ সালে ৪৭৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৫২, ২০১৪ সালে ৪৮৮ ও ২০১৩ সালে ৩৭০ জনকে পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয়।

ইউজিসির প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পিএইচডি ডিগ্রির তথ্য আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে পিএইচডি ও এমফিল ডিগ্রির তথ্য একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, দেশের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের হার বেশি। উচ্চশিক্ষার তদারককারী এ সংস্থার সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠ থেকে ওই বছর ১৩৩ জন গবেষককে পিএইচডি ও এমফিলসহ অন্যান্য উচ্চতর ডিগ্রি দেয়া হয়। উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানে ওই বছর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে ১২৮ জন গবেষককে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি দিয়েছে। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ওই বছর এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি দিয়েছে ১০৭ জনকে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০২০ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৭২ জন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ৬৫, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ৫৭ ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ৫৩ জনকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি দেয়।

উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশির দশকের আগ পর্যন্ত দেশের শিক্ষক ও গবেষকরা পিএইচডি অর্জনের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই বিদেশনির্ভর ছিলেন। যদিও দুই-তিন দশক ধরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পিএইচডি গ্রহণের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। প্রবণতা বাড়ার বিষয়ে শিক্ষাবিদরা বলছেন, কম পরিশ্রমে ডিগ্রি লাভের সুযোগ ও নন-একাডেমিক পেশাজীবীদের মধ্যে ডিগ্রি লাভের ঝোঁকের কারণেই দেশে পিএইচডি প্রদানের হার বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় যেমন পাসের হার ও জিপিএ ৫-এর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে শিক্ষার মানের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। একইভাবে পিএইচডি ডিগ্রির সংখ্যার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার মানের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাবে না। পিএইচডি তত্ত্বাবধানের জন্য যে যোগ্যতাসম্পন্ন অধ্যাপকের প্রয়োজন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সেটির অভাবও চোখে পড়ার মতো। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, গবেষণা নয় বরং পিএইচডিহোল্ডারদের একটি বড় অংশ এ ডিগ্রি নিচ্ছেন নামের আগে ড. বসানোর জন্য।

এদিকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডি অর্জনের জন্য অধ্যয়নরত গবেষকের সংখ্যাও কম নয়। ২০২০ সালে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ৩ হাজার ৬৪৬ জন পিএইচডি গবেষক অধ্যয়নরত ছিলেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৬৫ জন ছাত্র ও ৯৮১ জন ছাত্রী। দেশের উচ্চশিক্ষায় পিএইচডি প্রদানের এখতিয়ায় রয়েছে একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। যদিও শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদনের জন্য দাবি জানানো হচ্ছে। বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার অনুমোদন পেলে দেশে পিএইচডির এ হার আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, দেশে পিএইচডি ডিগ্রি বৃদ্ধির হার অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এ বৃদ্ধি কতটুকু গুণগত উপায়ে ঘটছে, সেটিও পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। বিশ্বব্যাপী শিক্ষক ও গবেষকরা পেশাগত উত্কর্ষের জন্যই পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের এ ডিগ্রি দেয়া হয়। যদিও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো শুধু আলংকারিক উদ্দেশ্যে এ ধরনের উচ্চতর ডিগ্রি দিচ্ছে। রাজনৈতিক কিংবা পেশাগত জীবনে সামাজিক মর্যাদা লাভ কিংবা পদোন্নতি পেতে পিএইচডি নেয়া বা দেয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *